১৯৯৩ সালে অক্সফোর্ডে ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট’ শীর্ষক বক্তৃতা থেকে শুরু করে ২০০৬ সালে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউনিটি ইন ফেইথ’, ২০১০ সালে ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট’ এবং বিভিন্ন সময়ে রমজান উপলক্ষে দেওয়া তার বার্তা—সব মিলিয়ে ইসলাম ও মুসলিম সমাজ সম্পর্কে তার একটি ধারাবাহিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
চার্লসের বক্তব্যের বিশেষত্ব হলো, তিনি ইসলামকে কেবল একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস হিসেবে বিবেচনা করেননি। বরং মানবসভ্যতার জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে ইসলামের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে মুসলিম ও পশ্চিমা সমাজের পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি, ঐতিহাসিক বিদ্বেষ, বস্তুবাদ এবং ধর্মীয় চরমপন্থার সমালোচনা করেছেন।
১৯৯৩ সালের ২৭ অক্টোবর অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের উদ্যোগে শেলডোনিয়ান থিয়েটারে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, ইসলামি ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা ইসলামি বিশ্বের কাছে যে ঋণী, সে সম্পর্কে পাশ্চাত্যে যথেষ্ট সচেতনতা নেই। মধ্যযুগে মুসলিম পণ্ডিতেরা গ্রিক ও রোমান দর্শন, বিজ্ঞান ও ধ্রুপদি জ্ঞান সংরক্ষণ, অনুবাদ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে পরবর্তী ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ভিত্তি তৈরিতে অবদান রেখেছেন। তিনি বলেন, ইসলাম ইউরোপের অতীত ও বর্তমানের অংশ।
আরও পড়ুন
এ বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন, ইসলাম মানুষ ও প্রকৃতি, ধর্ম ও বিজ্ঞান, মন ও পদার্থের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে না; বিশ্বজগৎকে একটি সমন্বিত বাস্তবতা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সংরক্ষণ করেছে। তার মতে, ইসলাম সম্পর্কে পশ্চিমা সমাজের বিচার অনেক সময় চরমপন্থি কিছু উদাহরণের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছে; চরমপন্থা ইসলামের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়, খ্রিষ্টধর্মসহ অন্য কোনো ধর্মেরও নয়।
১৯৯৬ সালে উইল্টন পার্কে ‘এ সেন্স অব দ্য সেক্রেড’ বক্তৃতায় তিনি বলেন, ইসলামি ঐতিহ্যে প্রকৃতি নিছক মানুষের ভোগের উপকরণ নয়; প্রকৃতির নিজস্ব মর্যাদা রয়েছে এবং মানুষের দায়িত্ব হলো তার ভারসাম্য রক্ষা করা।
২০০৫ সালে লন্ডনে সন্ত্রাসী হামলার পর তিনি মুসলমানদের সামগ্রিকভাবে দায়ী করার বিরোধিতা করে ডেইলি মিররে লেখেন, সমস্যার কারণ ইসলাম নয়; এটি ঐতিহ্যগত ইসলামের বিকৃতি। তার উপলব্ধিতে ইসলাম মানবতা, সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়।
২০০৬ সালে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউনিটি ইন ফেইথ’ বক্তৃতায় তিনি মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মের অভিন্ন ঐতিহ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেন। একই বক্তৃতায় তিনি মহানবী (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র বিতর্ক প্রসঙ্গে বলেন, অন্য মানুষের কাছে যা পবিত্র ও মূল্যবান, তা বোঝা ও সম্মান করতে ব্যর্থতার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
২০১০ সালে ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট’ বক্তৃতায় তিনি বলেন, বর্তমান পরিবেশ সংকটের মূল কারণ শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; মানুষের ভোগবাদী মানসিকতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়াও এর কারণ। ইসলামে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, অপচয় থেকে বিরত থাকা এবং সৃষ্টিজগতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের নৈতিক নির্দেশনা রয়েছে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় রমজান বার্তায় তিনি মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদানের প্রশংসা করেন এবং রমজানের দানশীলতা ও নিঃস্বার্থ সেবার শিক্ষা তুলে ধরেন।
২০২২ সালে রাজা হওয়ার পরও তার এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। ২০২৩ সালে কেনিয়া সফরে তিনি মোম্বাসার মান্দ্রি মসজিদ পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বকে বোঝা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি।
সব মিলিয়ে চার্লসের ইসলামবিষয়ক বক্তব্যকে শুধু সৌজন্যমূলক মন্তব্য হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা যাবে না। এগুলো পশ্চিমা সভ্যতার আত্মসমালোচনা, ইসলামি সভ্যতার ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি এবং আধুনিক বিশ্বের নৈতিক ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় ধর্মীয় জ্ঞানকে কাজে লাগানোর একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।