বিশ্বখ্যাত জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ার (Elsevier)।
দেশের সব সয়াবিন তেলেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, খোলা তেলে দূষণ বেশি: গবেষণা
গবেষণায় তিনটি ব্র্যান্ডের বোতলজাত এবং তিন ধরনের খোলা (নন-ব্র্যান্ডেড) সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, বোতলজাত তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। অর্থাৎ খোলা তেলে দূষণের মাত্রা ব্র্যান্ডেড তেলের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে তেজগাঁও এলাকার খোলা বাজার থেকে সংগ্রহ করা তেলের নমুনায় সর্বোচ্চ দূষণ পাওয়া গেছে। তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষণ, খোলা অবস্থায় বিক্রি এবং অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
অন্যদিকে, বোতলজাত তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ায় গবেষকদের ধারণা, উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং কিংবা পরিবহনের বিভিন্ন ধাপেও প্লাস্টিক কণা তেলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
যেসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে
গবেষণায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হলো লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (PET), পলিইউরেথেন (PU) এবং নাইলন।
শনাক্ত হওয়া কণার মধ্যে ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা তন্তুজাতীয়। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্ট, ফিল্ম, ফোম, পেলেট ও বিড ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকও পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এসব তন্তু সিনথেটিক কাপড়, প্লাস্টিক যন্ত্রাংশ, উৎপাদন পরিবেশ ও বাতাসে ভাসমান কৃত্রিম তন্তু থেকে আসতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত
গবেষণায় বলা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেল থেকেই প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরও বেশি। একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা গ্রহণ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে জমা হলে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এ গবেষণা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ প্রমাণ করেনি। বিষয়টি সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় এবং এ নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষকদের সুপারিশ
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় সয়াবিন তেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। তাই ভোজ্যতেল উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা জরুরি।
একই সঙ্গে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা সম্প্রসারণ এবং এ বিষয়ে কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নেরও সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।