অন্য দিকে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। একই সাথে আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা তার সাথে দেশে ফিরবেন, তার একটি তালিকাসহ ‘ডিসেম্বর টু মার্চ’ রূপরেখা বা রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনার নির্দেশে তার দেশে ফেরার অনুকূল প্রেক্ষাপট তৈরি করতে ও দেশকে অস্থিতিশীল করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে তার দোসররা। বর্তমান সরকারকে দুর্বল ও দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে তারা পরিকল্পিতভাবে নানামুখী প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীসহ তার বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের টার্গেট করে পেইড প্রচারণা চালাচ্ছে দেশী-বিদেশী চক্র
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ষড়যন্ত্রকারীদের এই চক্রান্তের ফাঁদে পা দিচ্ছেন বিএনপির কিছু অসাধু ও সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তি। সরকারের মধ্যে কাক্সিক্ষত সুবিধা করতে না পারা কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত মানুষদের টার্গেট করে ‘পেইড’ প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন।
সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচালিত এই পেইড প্রোপাগান্ডার পেছনে বর্তমান সরকারেরই এক মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবের (এপিএস) প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’-এর এক জরিপের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ৩৫১টি এবং প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ৫০টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংসহ তার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক এসব পরিকল্পিত অপপ্রচারের অন্যতম শিকারে পরিণত হয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম এবং শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। মূলত সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কের মুখে ফেলতে ও অসন্তোষ সৃষ্টি করতে এই দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীকে টার্গেট করে একের পর এক মনগড়া ইস্যু তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন
উল্লেখ্য, বিগত ১৭ বছর ধরে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সর্বস্তরে দলীয় বিবেচনায় নিজস্ব লোক নিয়োগ দিয়েছিল বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন সরকারকে বেআইনিভাবে টিকিয়ে রাখা, ভোটচুরি থেকে শুরু করে যাবতীয় অপকর্মে তারাই মূল ভূমিকা পালন করেছিল। বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ এখনো প্রশাসনের নানা স্তরে বহাল রয়েছেন। তারা মূলত এই সরকারকে চরম বেকায়দায় ফেলে এবং বর্তমান প্রশাসনকে সরিয়ে শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে প্রচ্ছন্ন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে তাদের বিগত দিনের দুর্নীতি ও লুটপাটের সাম্রাজ্য পুনর্বাসিত হয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে তারা ভেতরে ভেতরে বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিদের বিতর্কিত করার মিশন অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম এবং শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন মূলত এই প্রশাসনিক চক্রান্তের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত বা পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি এই ষড়যন্ত্রেরই একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। এই আন্দোলনকে পেছন থেকে উসকে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে চক্রান্তকারী মহল। তারা যখন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন সৃষ্টি করে, তখন দেখা গেছে সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অছাত্র, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বেশি।
জানা গেছে, শুরু থেকেই চক্রান্তকারীদের প্রধান টার্গেট ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পরপরই কিছু আমলার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে একটি আমলাতান্ত্রিক চক্র। এর পাশাপাশি বিএনপির ভেতরের একটি অংশও মীর শাহ আলমের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তাকে বিতর্কিত ও অসৎ হিসেবে উপস্থাপন করতে একটি মহল মরিয়া হয়ে ওঠে। এদের সাথে হাত মেলায় সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ‘পেইড প্রোপাগান্ডা গ্রুপ’ এবং আওয়ামী লীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের নেতারা।
মীর শাহ আলম তার পরিবারের কারো নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা না করার জন্য লিখিত নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো সত্ত্বেও, সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলতে তার পরিবারের সদস্যের নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে সেই ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যটিকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে তাকে ব্যাপকভাবে ট্রোল ও অপপ্রচারের শিকার করা হয়। না বুঝে এবং প্রকৃত তথ্য না জেনে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও সেই অপপ্রচারে গা ভাসিয়ে সমালোচনা শুরু করেন। শুধু দেশে নয়, বিদেশ বসেও কিছু ব্লগার অর্থের বিনিময়ে প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন, যার পেছনে সরকারের এক মন্ত্রীর এপিএসের নাম বারবার উঠে আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় কোনো বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে হলে আগে তার ডালপালা ছাঁটাই করতে হয়। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা বর্তমান সরকারকে দুর্বল করার জন্য এই একই কৌশল অবলম্বন করছে। সেজন্যই তারা প্রধানমন্ত্রীর চার পাশের বিশ্বস্ত মানুষদের টার্গেট করে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে সার্বিকভাবে সরকারের ওপর থেকে জনআস্থা চির ধরে।
কারণ প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মানুষের বিরুদ্ধে কোনো অপপ্রচার চালানো হলে সাধারণ মানুষ তা সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি এই দুর্বলতার সুযোগটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, “আমি মনে করি এটা এক ধরনের গভীর ষড়যন্ত্র। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত, তারা মানসিক দিক থেকে খুবই হীনমন্য এবং পরশ্রীকাতর। সরকারের উচিত অবিলম্বে এসব প্রোপাগান্ডাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।” বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব এ বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, “তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো অপপ্রচার ছড়িয়ে দেয়া সমাজে বিভ্রান্তি, ফিতনা ও পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। ইসলামে এ ধরনের কাজকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোকে অশ্লীলতা ও ফিতনার শামিল মনে করা হয়।”
তিনি আরো যোগ করেন : “গুজব ও প্রোপাগান্ডা থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো- যেকোনো সংবাদ সত্য কি না তা ভালোভাবে যাচাই করা, সত্য ছাড়া মিথ্যা কিছু না বলা, অন্যের সম্মান রক্ষা করা এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: স্পষ্ট বাণী দিয়েছেন : ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ সুতরাং আমাদের সবার উচিত এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা।